স্বীকারোক্তি

সত্যি বলতে সায়ানের মা শিউলি মারা যাবার পর পর আমি সত্যিকারের এক অথৈ সাগরে পড়েছিলাম।

আমাদের প্রায় আঠারো বছরের সংসার ছিল। সুখী ছিলাম কিনা সেটা বলার চেয়ে শিউলির শারীরিক অসুস্থতার কথা বিবেচনায় নিলে বরং বলা নিরাপদ হবে, আমাদের দাম্পত্য জীবন মোটামুটি নিরুপদ্রপ কেটেছিলো। আমাদের একমাত্র ছেলে সন্তান বিয়ের ছয় বছরের মাথায় পৃথিবীতে আসে। শিউলির শারীরিক সমস্যা ছিল, চার চারবার মিস-ক্যারেজ হয়েছিল সায়ান আসার আগে। তাই, সায়ানের কনসিভের প্রায় পুরো সময়টা ওকে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল।

আমার খুব বেশি নিকট আত্মীয় ছিলেন না এই শহরে, আমার বিধবা মা তার দ্বিতীয় ছেলের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় থাকতেন। উনি মাঝে মাস খানেকের জন্য এসেছিলেন, সেই সময়টা আমি নিয়মিত অফিস করতে পারতাম। শিউলি এতিম ছিল, ওর একমাত্র মামা’র কাছে থেকে পড়াশোনা করেছিল। আমরা ঢাকা ভার্সিটিতে একসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়তাম, ও খুব মেধাবী ছিল। ফোর্থ ইয়ারে উঠতে আমরা দুজন দুজনার বেশ কাছে এসে পড়ি। অনার্স শেষ করে দুজনেই আইবিএ থেকে এমবিএ করেছিলাম। ও ঢাকার উত্তরায় নরওয়ের একটি ফার্মে ভালো চাকরিতে ঢুকে যায়, আর আমি বিসিএসটা দিয়ে দেই।

বিসিএসে খুব ভালো রেজাল্ট হলো, আর চাকরি হয়ে যেতেই বিয়ে করে ফেলি। শিউলির অফিসের কাছাকাছি থাকার জন্য উত্তরার এগারো নম্বর সেক্টরে বেশ বড়ো একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে উঠে পড়ি।

আমাদের দুজনেরই পারিবারিক দায় প্রায় ছিলই না, তাই হাতে প্রচুর টাকা জমে গিয়েছিল। বিয়ের দ্বিতীয় বছরে প্রথম মিস-ক্যারেজের পর সিঙ্গাপুর যেয়ে ডাক্তার দেখাই। শিউলি অসম্ভব উচ্ছল এক মেয়ে ছিলো। সারাক্ষণ কথা বলে মাতিয়ে রাখতো। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকেরা ওর জরায়ুর বিশেষ সমস্যার কথা বলার পর থেকে হঠাৎ করে মুষড়ে পড়ে। বেশ চুপচাপ হয়ে যায়।

ডাক্তারের পরামর্শমতো সেবার বেশ বড়ো একটা ছুটি নিয়েছিলাম আমি। শিউলির কাছে বাচ্চা হওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, সে চাকরিটা ছেড়ে দেয়। আমার এখন মনে হয়, সে নিজে এতিম ছিল বলেই বাচ্চা নেবার জন্য এতো উতলা হয়ে পড়েছিল। নাড়িছেঁড়া ধন, নিজের রক্ত বহন করছে, এই অনুভূতির কাছে হয়তো অন্য সব কিছু খুব বেশি নগণ্য।

দূর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছেড়ে যায়নি কখনোই। সায়ানের জন্ম হবার সময় খুব বেশি জটিলতা হয়েছিল, শেষ মুহূর্তে অপারেশনে অংশ নেয়া এক ডাক্তার জানান শিউলির জরায়ুতে ছোট ছোট কিছু টিউমার দেখা যাচ্ছে, চাইলে একসাথেই অপারেশন করা হবে।

বায়োপসি রিপোর্ট খুব একটা সুখবর নিয়ে এলো না। সায়ানের জন্ম হবার একসপ্তাহের মধ্যে শিউলিকে দ্বিতীয়বার অপারেশনের টেবিলে উঠতে হলো। আমার খুব দুঃসময় ছিলো সেই দিনগুলো, কিভাবে যে মাথা ঠান্ডা রেখেছিলাম। ঢাকায় তিনটি কেমো থেরাপির পর শিউলিকে নিয়ে চেন্নাই চলে যাই। সেবার প্রায় দেড় মাস ছিলাম। শিউলির মনের জোর ছিল বলার মতো, কী হাসিমুখে কেমো নেবার প্রচণ্ড ব্যথা সহ্য করে যাচ্ছিলো। সায়ান আমাদের সাথেই ছিলো, ওকে দেখাশোনা করার জন্য হাসপাতাল থেকে একজন নার্সের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঢাকায় ফিরে আসতে খেয়াল করলাম হাতের জমানো টাকায় টান পড়ে যাচ্ছে। আর, আমার নৈতিক অধঃপতনের সেই শুরু। যে কোন ভাবে প্রচুর টাকা চাই আমার, তাই, কোন বাছ বিচার ছাড়াই ঘুষ খাওয়া শুরু করি।

প্রথম পর্যায়ের কেমোর পর শিউলি দ্রুত সুস্থ্য হয়ে উঠেছিল। ছয় মাস পর পর আমরা চেন্নাই, নয়তো সিঙ্গাপুর যেতাম চেক আপ করার জন্য। নতুন জীবনটি বেশ মানিয়ে নিয়েছিলাম। শিউলিকে কাউন্সেলিং করাচ্ছিলাম ঢাকা ভার্সিটির ক্লিনিক্যাল সাইকোথেরাপির এক অধ্যাপকের কাছে। উনার বুদ্ধিতে শিউলি এই সময়টায় বনসাই করা শিখে নিলো। দেখা গেল, বনসাই করায় ওর দারুণ হাত। সায়ানকে সময় দেবার পর তাই বনসাই ওর দ্বিতীয় নেশায় পরিনত হয়েছিল।

শিউলির চিকিৎসায় জলের মতো টাকা ঢালতে কখনোই কার্পণ্য করিনি। এত খরচ করার পরও আমার টাকার কখনো অভাব হয়নি। যেমন, ঢাকা ময়মনসিংহ হাইওয়ের কাজ হচ্ছিলো, কে.কে কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে একটি অংশের কাজ পাইয়ে দিতে হাতে বেশ বড়ো এক থোক টাকা এসে গিয়েছিলো। সায়ানের তখন পাঁচ বছর বয়েস। বুদ্ধিটা শিউলিই দিয়েছিলো। উত্তরার থার্ড ফেজে দশ কাঠার একটা প্লট কিনে তাতে তিনতলা এক বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি করে ফেলি। টাকার উৎস দেখাই আমার ভাই এবং মা পাঠিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। রেজিস্ট্রেশন করিয়েছিলাম শিউলির নামে। এই বাড়ি ছাড়াও বসুন্ধরায় দুই হাজার ফিটের একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছিলাম, সেটাও ছিল শিউলির নামে।

সায়ান ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছিলো, কিন্তু, এখন মনে হয়, ওকে ঠিকভাবে মানুষ করতে পারিনি। টাকার কোন অভাব ছিল না। তাছাড়া, মায়ের অসুস্থতার কারনে হয়তো ওকে সময় দেয়া হচ্ছে না ঠিকভাবে, এই ভাবনায়, অথবা অন্য কোন কারনেই হোক, ওকে নানাভাবে প্রশ্রয় দেয়া হতো। ওর দুটো রুম ছিল, একটি রুম ওর খেলার জন্য রাখা হয়েছিলো। সব ধরণের খেলনায় ওর ঘর ছিল ভর্তি। আজ মনে হচ্ছে, অনেক খেলনাই হয়তো ও কখনো ছুঁয়েও দেখেনি।

সেদিনের কথা বেশ মনে আছে, সায়ান তখন সবে ক্লাস ফোরে উঠেছে, পড়তো গুলশানের নামকরা এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। ওকে স্কুলে আনা নেয়া শিউলি নিজেই করতো। আমি দুপুরে এক জরুরী মিটিং এ ছিলাম। এক অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন কল আসে। আমি তিন তিন বার কেটে দিয়েছিলাম, ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলাম মিটিং এর কথা বলে, তারপরও চতুর্থবার যখন ফোন আসলো, আমি ‘স্যরি’ বলে উঠে বাইরে চলে এসে ফোনটা রিসিভ করি। আর একটি কথাই অপরিচিত একটি মেয়ে বারবার বলছিলো, ‘আপনার স্ত্রী পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি, দ্রুত চলে আসুন’। আমার মাথা কাজ করছিলো না। আমার স্ত্রী আর ছেলে সায়ানকে নিয়ে গাড়িটি এক্সিডেন্টে পড়েছিল। আমি সাথে সাথেই হাসপাতালে চলে যাই। তেমন বড় কোন এক্সিডেন্ট নয়, সায়ানের কিছুই হয়নি। ড্রাইভার অল্প আহত হয়েছিল, এক্সিডেন্ট করার পর পরই সে পালিয়ে গেছে। শিউলি মাথায় আঘাত পেয়েছিল বলে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো। তবে, এই এক্সিডেন্টের ফলে একটা ভীষণ ক্ষতি হয়ে গিয়েছিলো বলে আমার বিশ্বাস। শিউলি ট্রমাক্রান্ত হয়ে পড়লো। আর তাতে ওর মনোবল ভেঙে গেল। যে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে সে এতোদিন লড়াই করে এসেছিলো, সেই লড়াইটায় ভাটা পড়ে গেল।

ওর জীবনের শেষ একটা বছর ভয়ানক দুঃস্বপ্নে কেটেছে। ও পাগলের মতো আচরণ করতো। ব্যথায় সারারাত চিৎকার করে কাঁদতো। ক্যানসার ততোদিনে ওর লাংগস এবং লিভারে আক্রমণ করে ফেলেছে। হঠাৎ করেই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লো। আমার একার পক্ষে শিউলিকে দেখাশোনা করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। সাথে সায়ানের স্কুল। সেই সময়ে আমার মা তার নানা বাড়ির গ্রাম থেকে একটি মেয়েকে আমাদের বাসায় আনার ব্যবস্থা করে দেন। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে। নাম কুসুম। বয়স খুব বেশি নয় হয়তো বা, গ্রামেই সারাজীবন কেটেছে। তাছাড়া অভাব অনটনে পড়ে শরীর হয়তো দ্রুত ভেঙে পড়েছিলো। দেখতে তিরিশ বা এর আশেপাশে মনে হতো।

সায়ানের মা মারা যাবার পর এই মেয়েটি আমাকে সেই অথৈ সাগর থেকে সত্যিকার অর্থেই উদ্ধার করলো। একহাতে পুরো সংসারের দায়িত্ব নিয়ে নিলো। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না বান্না, সব কাজেই সে যথেষ্ঠ পারদর্শী ছিলো। তিনতলা বাড়িটার দেখাশোনাটাও বেশ ভালো ভাবেই করতো।

আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম, এটা সত্য। তবে, শিউলির দীর্ঘ মেয়াদের চিকিৎসা করাতে করাতে এমন পরিস্থিতির সাথে বেশ খাপ খাইয়েও নিয়েছিলাম। তারপরও, কুসুম না থাকলে কোন ভাবেই মনে হয় না আমার একার পক্ষে এতকিছু সামলানো সম্ভব হতো। কিছুদিন যেতেই পরিচিতজনেরা আমার দ্বিতীয় বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলো। আমার পক্ষে সেটা সম্ভব ছিলো না, শিউলিকে আমি ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম। এই এতো দীর্ঘ দিন রাত ওর সেবা করে করে ওর এতো বেশি কাছে চলে গিয়েছিলাম যে, আমার পক্ষে অমন কিছু ভাবনাটাও অসম্ভব এক কল্পনা ছিলো। তাছাড়া সায়ান যথেষ্ঠ বড়ো হয়ে গিয়েছে এর মাঝে।

সময় হয়তো অনেক কিছুই বদলে দেয়, ভুলিয়ে দেয়। আমাকেও দিয়েছিল। নয়তো শিউলি মারা যাবার বছর চারেক পর আমার মাঝে পরিবর্তন আসবে কেন!

সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। শরীরটা ভালো লাগছিলো না, কাঁপুনির সাথে জ্বর অনুভব করছিলাম। অন্যান্য দিনে অফিস শেষে সায়ানকে বাসায় নিয়েই ফিরি। সামনেই ওর ও লেভেল পরীক্ষা। স্কুল শেষে ওর বিভিন্ন কোচিং থাকে। ব্যক্তিগত গাড়ীর ড্রাইভারকে বলে দেই সায়ানকে বাসায় নিয়ে আসবে। আর আমি সরকারী গাড়ী নিয়ে বাসায় চলে আসি।

বাসায় এসেই দোতলায় আমার রুমে যেয়ে কাপড় না ছেড়েই শুয়ে পড়েছিলাম। তীব্র মাথা ব্যথা নিয়েও কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙলো নরোম এক হাতের ছোঁয়ায়। ঘুমের ঘোরে মনে হচ্ছিল শিউলি আমার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, এতো বাস্তব ছিলো কল্পনাটা! ঘুম ভাঙতে চোখ মেলতেই প্রথমে বুঝতে পারিনি আমার পাশে কে। হঠাৎ খেয়াল হলো কুসুমের ডান হাত আমার হাতের মুঠোয়। খুব সম্ভবত ছাদে বৃষ্টিতে ভিজছিলো, ভেজা শাড়ি ওর নরোম দেহে লেপ্টে ছিলো। এতদিন খেয়াল করিনি। আমি ভাবতাম ও যখন গ্রাম থেকে আসে, সেদিনের মতো তেমনি শুকনোই আছে। আজ অবাক হয়ে দেখলাম খোলতাই এক দেহের ভাঁজ। সায়ান হবার পর মনে পড়ে না শেষ কবে নারী দেহ সেভাবে ছুঁয়ে দেখেছি, অথবা, খুব নোংরা শোনালেও সত্যি, শেষ কবে শারীরিক সম্পর্কে গিয়েছি, সেটাও মনে করতে পারি নি। কুসুমের ভেজা শরীর আমাকে তীব্র ভাবে আকর্ষণ করতে লাগলো। জ্বর শরীর নিয়ে সবেগে কসুমকে বুকে টেনে নিলাম। জানি না কেন, কুসুমও তীব্রভাবেই সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল!

সেই শুরু, আমরা প্রায় প্রতিদিন, প্রতিরাতেই মিলিত হতে লাগলাম। বুনো প্রাণীর মতো সেই মিলন। একা হলেই এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ছেয়ে থাকতো। একই সঙ্গে অপরাধবোধ এবং মিলনের তীব্রতা। মিলনের তীব্রতার কাছে অপরাধবোধ হার মানতো।

নদীতে যেমন জোয়ার ভাটা হয়, মানব দেহেও হয়তো তেমনি শরীরের প্রতি টানের জোয়ার ভাটা হয়। এক সময় কুসুমের দেহের প্রতি আকর্ষণের তীব্রতা কিছুটা ফিকে হতে লাগলো। তারপরও, ইচ্ছে বা অনিচ্ছায়, আমাদের মিলন হতে লাগলো।

কুসুমের সাথে লীলাখেলার এই পর্যায়ে এতটাই আবেশিত হয়ে পড়েছিলাম যে, ছেলে সায়ানের পড়াশোনা কেমন হচ্ছে, অথবা আদৌ পড়ছে কিনা, খোঁজ নেবার আগ্রহটুকু হারিয়ে ফেলেছিলাম। একদিন জিজ্ঞেস করাতে বলল, সে আট সাবজেক্টের দুটো দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। এই বছর বাকী পরীক্ষাগুলো আর দেবে না! আমি বরাবরই সায়ানকে জিনিয়াস ভাবতাম। ওর বাবা মায়ের রক্ত কিছুটাও যদি ওর মধ্যে থেকে থাকে, তাতে তার জিনিয়াস হবারই কথা। অথচ, নির্মম বাস্তবতা হলো, সে যে পড়াশোনায় এত অধঃপতনে গিয়েছে, তা আমার ক্ষণিকের কল্পনাতেও আসেনি। আমি হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে পড়েছিলাম হয়তো। যা জীবনেও কখনো করিনি, হঠাৎ ওর বা গালে আমার ডান হাতের তীব্র চড়ের শব্দে আমি নিজেই চমকে উঠেছিলাম!

দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিল সায়ান সাথে সাথেই। ও থাকতো তিনতলায়। একাকী। আর আমি দোতলায়, কুসুম থাকতো নিচের তলায়। আমি নিজের ঘরে এসে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। রাতের খাবারের সময় সায়ানের কথা মনে হলো। আর এক ধরণের অপরাধবোধে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। খাবারের ব্যবস্থা একতলাতে। আমি তিনতলায় সায়ানের ঘরে চলে গেলাম। নক করতেও ভেতর থেকে কোন সাড়া পেলাম না। নব হাল্কা ঘোরাতেই খুলে গেল দরোজা। ভেতরে সায়ান নেই।

কিছুক্ষণ ওর ঘরে ঘোরাঘুরি করে নীচে নেমে এসে কুসুমকে জিজ্ঞেস করলাম। বলল সায়ান বন্ধুদের নিয়ে বাইরে গেছে, খেয়ে ফিরবে রাতে।

আমি আমার স্বীকারোক্তির শেষ ধাপে চলে এসেছি।

সে রাত্রে অস্বাভাবিক কিছু একটা হয়তো টের পেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারিনি। অথবা বলতে হয়, ব্যবস্থা নেবার অবস্থায় আমি ছিলাম না। নিজের এত শত পাপ সততার জায়গাটাকে ভীষণভাবে আচ্ছাদন করে রেখেছিল।

এক রাতে খুব জরুরী একটা ফাইল বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। বড়ো একটা ক্রয়সংক্রান্ত ফাইল। আমার ডিসিশনের অপেক্ষায় পুরো প্রকল্প। ভেবেছিলাম রাতেই দেখে সকালে সাথে করে অফিসে নিয়ে যাব। কিন্তু কুসুম আমাকে বেশ রাত করে জাগিয়ে রেখেছিল। ভোরে উঠতে দেরি হয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করে অফিসে চলে গিয়েছিলাম ফাইলটা না নিয়েই।

অফিসে পৌছুতেই মনে পড়েছিল, কিন্তু শুধু ড্রাইভারকে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফাইল নিয়ে আসতে পাঠাতে পারি না। তাছাড়া, অন্যায্য এবং অসংগত অনেক কিছুই ছিল সেই ফাইলে। তাই ঠিক করলাম, সকালের প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্টের সাথে মিটিংটা করে দুপুর গড়াবার আগেই বাসায় ফিরে গিয়ে ফাইলটা নিয়ে আসবো।

বাড়ির সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা আনসারের ছেলেটা বাইরের দরোজা খুলে দিলেও মূল বাড়িতে ঢোকার দরোজা বন্ধ পেলাম। হাতে সময় নেই। বারংবার তাই কলিংবেল চাপতে লাগলাম। সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা ছেলেটা বলেছে কেউ আসেনি বাড়িতে। আর সায়ানও বাড়িতেই আছে। পাঁচ মিনিটের মতো হয়ে গেছে, আমাকে অফিসে ফিরতে হবে। কারো কোন সাড়া শব্দ নেই। হঠাৎ মনে হলো গাড়িতে ডুপ্লিকেট একটা চাবি থাকার কথা। ড্রাইভারকে দিয়ে চাবিটা নিয়ে দরোজা খুলে দোতলায় উঠতেই শুনি তিনতলা থেকে মেয়েলি কণ্ঠের হি হি হাসি ভেসে আসছে, সেই সাথে সায়ানের মৃদু স্বরে কথাও শোনা যাচ্ছে।

হাত পা কাঁপছিলো রীতিমতো। মাথায় কিছু কাজ করছিলো না, একেবারে শূণ্য। কাচের সাইড টেবিলে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢক ঢক করে এক চুমুকে খেয়ে নিলাম। হয়তো বেশ জোড়েই রেখেছিলাম জগটিকে, ঠিক খেয়াল করিনি। তবে ঝন ঝন করে বেশ জোড়ে শব্দ হয়েছিল! হাল্কা পায়ের শব্দে তিন তলার দিকে প্যাঁচানো যে সিঁড়ি উঠে গেছে, তার মাথায় চোখ যেতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম! কুসুমের প্রায় নগ্ন দেহ, কোণায় দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছিলো নিচে কে বা কি হচ্ছে। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই ও ধপাস করে সিঁড়ির গোড়াতেই বসে পড়লো, অথবা ধপাস শব্দে পড়ে গেল, ঠিক মনে নেই। ও বসে পড়তেই দেখি সায়ানের গলা, “বেবি কি হয়েছে তোমার”! খালি গায়ে শুধু বক্সার পরা সায়ান কুসুমের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষনে, আমাকে দেখামাত্রই পেছনে ঘুরে এক দৌড়ে আড়ালে চলে গেল। আমি শকে, শোকে এবং ভয়ংকর এক বেদনাবোধে ভীষণ ক্লান্তবোধ করতে লাগলাম। আমার মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসলেও হয়তো আমি এতটা বিমূঢ় হয়ে পড়তাম না।

মনে পড়ে, সায়ানকে চড় মেরে সেদিন বেশ আত্মকষ্টে ভুগেছিলাম। সে রাতের কথা ঘুন পোকার কাঠ কাটার সুতীব্র একঘেয়ে শব্দের মতো মাথার ভেতরে কিড়বিড় করে উঠলো। সায়ানের পড়ার টেবিলের ফাঁক গলে ফ্লোরে দুটো ব্যবহার করা কনডমের প্যাকেট চোখে পড়েছিলো। ছোট ছোট লাল রঙের কিছু ট্যাবলেটও পড়ে ছিল পড়ার টেবিলের উপর। যা হয়, নিজের ছেলের প্রতি তীব্র বিশ্বাস থেকে আমি অন্য কোন অর্থ সে রাত্রে খুঁজে পাইনি।

খ্রীস্টান ধর্মে পাপ খণ্ডাবার একটা চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ চাইলেই চার্চে যেয়ে দেয়ালের আড়ালে বসা ধর্মযাজককের কাছে নিজের করা কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি করতে পারে। তাতে তার পাপ লাঘব হয়। কিন্তু আমাদের ধর্মে এমন কোন কিছু নেই। তাই বিজ্ঞ পাঠকদের কাছে আমার এই সরল স্বীকারোক্তি। জানি না এতে আমার পাপ কাটা যাবে কিনা, অথবা, এই ভয়ানক স্মৃতি চিরতরে ভুলেই বা যেতে পারবো কিনা।

(সমাপ্ত)

– MONOWAR HOSSAIN

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
1
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
মো: মাইদুল সরকার
Member

দুর্দারান্ত এক গল্প।

Recent Comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!