লজিং মাস্টারের কত কথা

পঞ্চাশ, ষাট আর সত্তর দশকে সারা দেশ জুড়ে লজিং মাস্টার প্রথার প্রচলন ছিল। তখনকার সময়ে হাইস্কুল এবং কলেজ গুলো অনেক দূরে দূরে থাকার কারণে অনেকের পক্ষে সেখানে যাতায়াত করে পড়াশোনা সম্ভব ছিলনা। তার বদলে এসমস্ত ইচ্ছুক ছাত্ররা স্কুলের আশেপাশের গ্রামে অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের বাড়িতে লজিং থাকতেন। যদিও‌ তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা করানো তথাপি এর বাইরেও তাদের অনেক ধরনের কাজ করতে হতো।

এই সমস্ত লজিং মাস্টার বা জায়গীর মাস্টাররা সাধারণত বাড়ির প্রবেশপথে অবস্থিত বৈঠকখানা অথবা কাঁচারী ঘরে থাকতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়ির একটা পরিবারই তাকে খাওয়ানোর দায়িত্ব বহন করতো। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবারকে চক্রাকারে খাওয়ানোর দায়িত্ব দেয়া হতো। বিনিময় বাড়ির সকল অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব তাকে পালন করতে হতো।

এসমস্ত লজিং মাস্টারের জীবনের সাথে প্রেম একটি অত্যন্ত বহুল আলোচিত উপাখ্যান। আজকের বিষয়টা মুলত সেটাকেই আবর্তন করেই। বাড়িতে লজিং মাস্টার রাখার পেছনে অনেকের মনেই একটি সুপ্ত ইচ্ছা কাজ করতো। সেটা ছিল লজিং মাস্টারের সাথে মেয়ের বিবাহ দেয়া।

সাধারণত ছাত্র-ছাত্রীরা সন্ধ্যার পরে মুল বাড়ি থেকে হারিকেন আর বইপত্র নিয়ে কাচারি ঘরে চলে যেত লজিং মাস্টারের কাছে পড়তে। কোন কোন অতি সাবধানী মা এক্ষেত্রে ছোট ছেলে মেয়েদের গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ করত। এদের কাজ ছিল কিশোরী বোন লজিং মাস্টারের সাথে কোনরকম প্রেম-ভালোবাসা জাতীয় কথাবার্তা বা অভিনয় করছে কিনা সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। করে থাকলে পড়া শেষে এটা তার মায়ের কাছে রিপোর্ট করা। আবার মাঝে মাঝে এখানে বিপত্তি ও ঘটতো। কিশোরী বোনেরা কোন কোন সময় ছোট ভাই বোনদেরকে পটিয়ে ফেলতো যার ফলে মায়ের পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতো না।

যদিও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে একটা সময় প্রেমটা জমে উঠত তথাপি এ পথ ছিলো বিপদসংকুল। কারণ কোন কোন মা-বাবা এটাকে প্রশ্রয় দিতেন না। এই আসন্ন বিপদের কথা মাথায় রেখেই লজিং মাস্টার এবং কিশোরী ছাত্রীরা প্রেম এগিয়ে নিতে নানান রকম নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতো যেমন: টেবিলের নিচে দিয়ে পায়ের আঙ্গুলে আঙ্গুল ছোঁয়ানো, পড়া শেষে বই বা খাতার মধ্যে লুকিয়ে প্রেমপত্র ঢুকিয়ে দেয়া, আড়চোখে একজন আরেকজনের দিকে তাকানো, পড়া দেখিয়ে দেয়ার সময় ইচ্ছে করে হাতের আঙ্গুলে আঙ্গুল ছোঁয়ানো, কারনে অকারনে অতিরিক্ত হাসা, বাড়ির কাজ দেখানোর সময় কায়দা করে খাতার মধ্যে প্রেমপত্র ঢুকিয়ে দেয়া, বাড়ির ছোট ছোট ছেলে মেয়ে বা কাজের লোককে পয়সা বা অন্য কোন কিছুর লোভ দেখিয়ে চিঠি আদান প্রদান করা, হাতের মধ্যে কালি দিয়ে “আমি তোমাকে ভালবাসি” জাতীয় কথাবার্তা লিখে একে অন্যকে দেখানো ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি একবার আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে একটি প্রেম পত্র উদ্ধার করেছিলাম। ছাত্র-ছাত্রীরা পড়া শেষ করে বাড়িতে ফিরে আসার পর হারিকেনের চিমনির সাথে সাঁটা একটি কাগজ উৎসুক মনে খুলে দেখি লজিং মাস্টার ছাত্রীকে একটি প্রেম পত্র লিখে তা চিমনির সাথে আটকে দিয়েছে। এই পদ্ধতি একবারই নতুন এবং উদ্ভাবনী। কারন পড়ার সময় আলো থেকে চোখ বাঁচানোর জন্য অনেকেই এরকম একটি কাগজ হারিকেনে লাগিয়ে রাখতেন। কাজেই এই পদ্ধতিতে সন্দেহের অবকাশ ছিল একেবারেই শূন্য।

কিছু কিছু মা বাবা যারা লজিং মাস্টারের সাথে মেয়েকে বিবাহ দেয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী থাকতেন তাঁরা বিভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করে লজিং মাস্টারের সাথে মেয়ের দেখাশোনার বা কথা বলার সুযোগ করে দিতেন। যেমন স্যারকে ডেকে নিয়ে আয়, নাস্তাটা দিয়ে আয়, স্যারকে বলে আয় আম্মা বলেছে বাজার থেকে এই জিনিসটা নিয়ে আসতে। এগুলো ছিল মূলত অজুহাত যাতে করে দুজনে একটু মন খুলে কথা বলার খানিকটা সময় পায়।

অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্ত লজিং মাস্টার রা ছিল অপেক্ষাকৃত গরিব। কিন্তু ছাত্র হিসেবে মেধাবী। কাজেই তাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের কথা ভেবেই অনেক বাবা-মা লজিং মাস্টারের সাথে মেয়ের বিবাহে আগ্রহ দেখাতেন। আমাদের দেশে বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই তাদের ছাত্রজীবনে কোন এক সময় লজিং মাস্টার হিসেবে কাটিয়েছেন। এদের সাথে মেয়ের বিবাহ দেয়া ছিল সে সমস্ত মা-বাবাদের একটি অত্যন্ত বাস্তব সম্মত ধারণা যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য।

আবার এমনও হয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পাত্রীকে ও পরিস্থিতির চাপে পড়ে লজিং মাস্টারকে বিয়ে করতে হয়েছে। যাই হোক সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম থাকে। এখানে কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

একটি বিষয় বলে শেষ করছি। প্রায় ক্ষেত্রেই এই সমস্ত লজিং মাস্টাররা নিজেদেরকে নায়ক নায়ক ভাবতেন। কারণ অপেক্ষাকৃত ভাল ছাত্র আর সম্ভাবনাময় কিশোর/তরুণ হিসেবে বিয়ের বাজারে পাত্র হিসেবে আশেপাশে তার যথেষ্ট কদর ছিল। কাজেই এসমস্ত লজিং মাস্টারদের চলাফেরা আচার-আচরণ আর কথাবার্তায় মাঝে মাঝেই একটি হিরো হিরো ভাব দেখা যেত।

মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
টরন্টো, কানাডা।
জুলাই, ২০২০।

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Written by
Aowrangazeb Chowdhury
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
মো: মাইদুল সরকার
Member

এ বিষয়টা নিয়ে দারুন একটা গল্প লিখে ফেলুন।

Recent Comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!